শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

‘ইসলাম’ জনগণ নিপীড়ন নয় নিরাপদ ও শান্তির ধর্ম

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
তাযিরের শাস্তিযোগ্য কতিপয় অপরাধ: মিথ্যা সাক্ষ্যদান, সুদ গ্রহণ, ঘুষ গ্রহণ, আমানতের খেয়ানত, পণ্য ক্রয় বিক্রয়ে ধোঁকা দেয়া, ওজনে কম দেয়া, বেশি গ্রহণ করা, প্রতারণা করা, কাউকে অপমান করা, অপরাধীকে আত্মগোপনে সহায়তা করা, যেনা ব্যতীত অন্য কোন অপবাদ আরোপ, নামায রোজা, যাকাত প্রভৃতি ফরজ কাজ ত্যাগ ইত্যাদি অপরাধে তাযিরের শাস্তি দেয়া যেতে পারে।
জননিরাপত্তা বিধানে তাযিরের শাস্তির গুরুত্ব: মানব সমাজে জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে তাযিরের শাস্তির বিধান সত্যি খুব ফলপ্রদ। কেননা হদ্দ ও কিসাস এ মাত্র কয়েকটি অপরাধের সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান করা হয়েছে। এর বাইরে হাজারও প্রকৃতির ও ধরনের অপরাধ রয়েছে বা সংঘটিত হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে ইসলামী আইন, অন্যান্য মানব রচিত আইনের মতো শাস্তির বিধান করে। বিচারকরে হাতকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ করে রাখেনি। বিচারক যে কোন অপরাধের নির্ধারিত অপরাদের শাস্তি ব্যতীত শাস্তি দিতে পারেন। এ থেকে বলা যায় যে, ইসলামী আইনে কোন অপরাধই শাস্তির আওতামুক্ত নয়। সকল অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে। সুতরাং মানব রচিত আইনে শাস্তির বিধান থেকে ইসলামী আইনে শাস্তি বিধান অধিক জননিরাপত্তা বিধানে কার্যকর।
ইসলামী আইনে জননিরাপত্তা বিধানে দণ্ড দর্শনের মর্মকথা: ইসলামী আইনে জননিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় শাস্তির বিধান প্রবর্তনের উদ্দেশ্য সমাজে আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে বিচ্যুতি বা লংঘনের দরুন সৃষ্ট অবস্থার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, যাতে সমাজে সুবিচার ও ন্যায় পরতা প্রতিষ্ঠিত থাকে।
শাস্তি দানের ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি: ক) অপরাধীর অপরাধ প্রবণ মন শাস্তির কঠোরতা দেখে যেন শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করে। শাস্তি দানের কঠোরতার সমাজে অপরাধের সংখ্যা দ্রুততার সাথে শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। কেননা শাস্তির কাঠোরতার মাত্রা যখনই কম করা হয় তখন সামজে অপরাদের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। খ) শাস্তির ভয়াবহতা: শাস্তিকে এমন ভাবে ভয়াবহ করে তোলা যাবে অপরাধী মনে একটা তীব্র ভীতির ভাব উদ্রেক হয় যদ্বারা অপরাধী অপরাধের পুনরাবৃত্তি থেকে বিরত থাকে। গ) প্রতিশোধ স্পৃহা চরিতার্থ করা: অপরাধ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মনে যে প্রতিশোধ স্পৃহা জেড়ে উঠে তা ইনাসাফপূর্ণ বাস্তায়বণের পরিবেশ সৃষ্টি করা।  সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূলের উপরোক্ত ভাবধারা সঠিক ভাবে অর্জনে তিনটি উপায় ইসলামী আইন সুনির্দিষ্টভাবে অবলম্বন করেছে: à§§. অপরাধমূলক কাজটি বাস্তবিকই অপরাধ হিসেবে চিহ্নিতকরণ। ২. অপরাধের জন্য অনুমোদিত শাস্তি যথার্থ, এছাড়া অন্য কিছু নয়। à§©. শাস্তি প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের প্রতি বলিষ্ট বিশ্বাস এবং শাস্তি দান প্রক্রিয়ার যথার্থ কার্যকারিতা।
উপরোক্ত বিষয় তিনটি কেবলমাত্র ইসলামেই সম্ভব, অন্য কোন মানব রচিত আইনে নয়। বস্তুত এ কারণে মানব রচিত আইনে অপরাধমূলক কর্মকান্ড চিহ্নিত, তার শাস্তির প্রকৃতি ও মাত্রা খুবই পরিবর্তনশীল হওযায়, অপরাধীকে শাস্তিদানের বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও অপরাধী কারোরই কোন দূর আস্থা থাকে না। দুর্নীতি ও অন্যান্য আনুকূল্যের কারণে শাস্তি প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের প্রতি শাস্তি ভোগকারীর বলিষ্ঠ কোন আস্থা থাকে না। এক্ষেত্রে শাস্তিদানের যে প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তা বহুলাংশে অপরাধের প্রশিক্ষণ এবং অপরাধ নিবৃত্তিমূলক শিক্ষা বর্জিত। বস্তুত এ কারণে মানচ রচিত আইনে জননিরাপত্তা বিধানে শাস্তির বিধান একটি হাস্যকর উদ্যেগ বলে বিবেচিত হয়।
দ্বিতীয়ত: সমাজের মানুষের প্রয়োজন পূরণের নিরাপত্তা বিধানের পদক্ষেপ: মানুষকে আল্লাহ্ এই পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধির দায়িত্ব দিয়ে আনুগত্যের পরীক্ষার জন্য সৃষ্টি করেছেন। রাষ্ট্রীয় সামাজিক জীবনে মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি মূলত মানুষের এই দায়িত্বের পরীক্ষার সফলতা ও ব্যর্থতার মধ্যে বিস্তৃত।
আল্লাহ্ পাক তাঁর সকল সৃষ্টিকে একমাত্র তাঁরই ইবাদত বা আনুগত্য করার জন্য সৃষ্টি পূর্বক আনুগত্যের জন্য যে সব উপকরণ ও বিধান প্রয়োজন তারও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা করেছেন। মানুষ ছাড়া সকল সৃষ্টির ক্ষেত্রে তা হয়ত কষ্টকর বিধায় সকল সৃষ্টির মানুষ ব্যতীত নিরাপত্তা সুনিশ্চিত। এজন্য তাদেরকে কারো মুখোপেক্ষী হতে হয় না বা তাদের নিরাপত্তা অন্য কোন সৃষ্টির মর্জির উপর নির্ভলশীল নয় বা কেউ তাতে হস্তক্ষেপ করে না। আল্লাহ্ বলেন- “যমিনে বিচরণশীল কোন জীব এমন নেই, যার রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহ্র উপর নয়, আর যার সম্বন্ধে তিনি জানেন না যে, কোথায় সে থাকে এবং কোথায় তাকে সোপর্দ করা হয়। সব কিছু এক লিপিকায় লিপিবদ্ধ রয়েছে।” সূরা হুদ: ৬। আল্লাহ্ পাক তাঁর সকল সৃষ্টির রিযিক অর্থাৎ জীবন নির্বাহের অপরিহার্য উপকরণ যথাযথ ভাবে যোগানের ব্যবস্থা করেছেন। অন্যান্য সৃষ্টির ন্যায় মানুসের জীবন নির্বাহের জন্যও প্রয়োজনীয় রিযিক আল্লাহ্ পাক যোগান বা বরাদ্দ করেছেন; কিন্তু তা আল্লাহ্র প্রতিনিধি হিসেবে আনুগত্যের দায়িত্ব পালন স্বরূপ আল্লাহ্র দেয়া বিধান মোতাবেক বণ্টন পূর্বক ভোগ ব্যবহার করার মধ্যে তাদের প্রয়োজন পূরণের নিরাপত্তা নিহিত।
মানব জাতির রিযিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আল্লাহ্র বিধান: “যেই আল্লাহ্ তোমাদেরকে প্রতিনিধি বানিয়েছেন এবং তোমাদের ভেতর থেকে কাউকে কারোর চাইতে উঁচু মর্যাদা দিয়েছেন। যেন তিনি তোমাদেরকে যা কিছু দান করেছেন তার ভেতর তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন।” সূরা আল আনয়াম: ১৬৫। “সম্পদ যেন কেবল ধনীদের মধ্যে আবর্তিত না হয়।” সূরা হাশর। “যারা স্বর্ণ রৌপ্য, টাকা পয়সা সঞ্চয় করে রাখে আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করে না তাদের কঠিন আযাবের সংবাদ দাও।” সূরা আত্ তওবা: ৩৪। “আর তাদের অর্থ সম্পদে অধিকার রয়েছে প্রার্থীদের (সাহায্য প্রার্থী) ও বঞ্চিতদের।” সূরা- যারীয়াত: ১৯। “আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর।” সূরা বাকারা: ২৮৪। “প্রার্থীদের প্রত্যেকের প্রয়োজন পরিমাণ খাদ্য সামগ্রী সঞ্চিত করে রেখেছেন।” সূরা- আস সাজদা: ১০।
উপরোক্ত আয়াত সমূহ হতে পরিষ্কার প্রতীয়মান হয় যে, মানুষের রিযিক অর্থাৎ প্রয়োজনীয় সম্পদ রাষ্ট্র সুষ্ঠুভাবে আল্লাহ্র দেয়া বন্টন নীতি অবলম্বনের মাধ্যমে প্রত্যেকের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। মানব সমাজে মানব প্রকৃতির প্রেক্ষিত প্রত্যেকের উপার্জন ক্ষমতা এক নয়। কেউ অধিক উপার্জন করে, কেউ পরিমিত, কেউ কম, কেউ একেবারেই নয়। এই বিচিত্র উপার্জনক্ষম লোকদের মাঝে ইনসাফ পূর্ণ বণ্টন নীতি অবলম্বন পূর্বক প্রত্যেকের প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবস্থা করাই হলো ইসলামী রাষ্ট্রীয় সমাজের প্রধান দায়িত্ব। রাষ্ট্রকে এজন্য অর্থাৎ জনগণের অর্থনৈতিক নিরাপাত্তা নিশ্চিতকরণে প্রধানত: দু’টি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
মানুষের প্রয়োজন নির্ধারণ: মানুষের প্রয়োজন সম্পর্কে ইমাম শাতিবী ও ইমাম গায্যালী রহ. একটি সুন্দর নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁরা মানুষের প্রয়োজনকে তিনটি ক্রমিক স্তরে বিন্যাস করেছেন। এগুলো হলো: ১. মৌলিক চাহিদা ২. স্বাচ্ছন্দ্যমূলক ৩. সৌন্দর্য্যমূলক।
এখানে রাষ্ট্রকে প্রথম প্রয়োজনটি পূরণে দায়িত্ব নিতে হবে। অবশিষ্ট দু’টি স্ব-স্ব ব্যক্তি স্বীয় উদ্যোগ পূরণে প্রবৃত্ত হবে।
মৌলিক চাহিদার মধ্যে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত: ১। বিশ্বাস ও আদর্শ: ঈমান, দীন ও আদর্শ। ২। জীবন-ধারণের জন্য আবশ্যক: অস্ত্র, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, পরিবেশ, যানবাহন, বিশুদ্ধ পানি, অবসর ইত্যাদি। ৩। পারিবারিক প্রয়োজন: পরিবার গঠন ও সংরক্ষণ। ৪। আকল: শিক্ষা ও বুদ্ধি মত্তার বিকাশ। ৫। সম্পত্তি: ন্যূনতম পরিমাণ ৬। স্বাধীনতা: চিন্তা, বিবেক অনুশীলন স্বাধীনতা। চাহিদা নিরূপণ পূর্বক, তা পূরণে কার কি সহযোগিতা প্রয়োজন তা নির্ণয় এবং তদানুযায়ী সহায়তা পরিকল্পনা ও কর্মসূচী অবলম্বন ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব, যাতে প্রত্যেক ব্যক্তির অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এক্ষেত্রে সমাজে চার শ্রেনির লোকের সন্ধান পাওয়া যায়। (ক) ধনীক শ্রেণি, (খ) পরিমিত উপার্জনক্ষম, (গ) মিসকিন ও (ঘ) ফকির।
মিসকিন তাদেরকে বলা হয় যারা উপার্জন দ্বারা প্রয়োজন পূরণ করতে পারে না। এবং ফকির তাদেরকে বলা হয় যাদের কিছুই নেই বা চরম দরিদ্র।
সম্পদের ইনসাফ পূর্ণ বণ্টন নীতি অবলম্বন: ইসলাম সম্পদের খোদাপ্রদত্ত ট্রান্সফার ম্যাকানিজম অবলম্বন পূর্বক সামজে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অবলম্বন ও সহায়তা করে: রাষ্ট্র যদি যাকাত, উশর কাফফারা ও সাদাকাহ খাত থেকে অর্থ সংগ্রহ করে দরিদ্র জনগণের মধ্যে সুষম বণ্টন করে তাহলে সমাজে কোন অভাবই থাকবে না। তখন রাষ্ট্রের সংগতিবান প্রত্যেকইে যাকাত আদায়ের শ্রেণিভুক্ত হবে। রাসূলুল্লাহ সাঃ এবং তদপরবর্তী খোলাফায়ে রাশেদার শাসন আমলে যাকাত গ্রহণকারী ছিলই না।
যদিও কোন ব্যক্তি থেকে থাকে তবে তারা যাকাত গ্রহণে অদৌ আগ্রহী ছিল না। ইসলামী অর্থনীতির সম্পদ ট্রান্সফার ম্যাকনিজম জনগণের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইসলাম ছাড়া অন্য কোন মানব রচিত ব্যবস্থায় এরূপ বৈশিষ্ট্য নেই, বরং এ বৈশিষ্ট্যের বিপরীত তা হলো অনুদিন দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হওয়া। পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থায় অর্থ সম্পদের মালিক মানুষ যে উপার্জন করে, এই অর্থ কেবল তার প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হবে। তাতে অন্যের কোন অধিকার নেই। অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে কোন নীতি নৈতিকতার বালাই নিষেধ নেই। এতে সমাজের অক্ষম ও অসহায় ব্যক্তিদের প্রয়োজন পূরণের মতো কোন সম্পদ থাকে না। তাই তাদের জীবনে কোনই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নেই।
অর্থশালী ব্যক্তিরাই সামাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত থাকায় তারা এসবকে কেবল স্বার্থোদ্ধারের কাজে ব্যবহার করে। ফরে রাষ্ট্রত্ব সকল সংগঠন দরিদ্র মানুসের জন্য নিপীড়ন ও জুলুমের হাতিয়ারে পরিণত হয়। দরিদ্র জনগণ বেঁচে থাকার তাগিদে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে জুলুমের শিকার হয়। পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থায় অর্থ হস্তান্তর প্রক্রিয়া এমন ভাবে প্রণীত ও বিন্যাস্ত যাতে সকল অর্থ সম্পদ ধনীদের হাতেই পুঞ্জিভূত হয়।
উপসংহার : কোন রাষ্ট্রীয় সমাজে বসবাসকারী জনগণের মৌলিক চাহিদা ইনসাফ পূর্ণভাবে পূরণের মধ্যেই কার্যত: তাদের নিরাপত্তা নিহিত। প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সমাজে বসবাসকারী তাদের কৃষ্টি অনুযায়ী পরিশীলনীয় নিরাপত্তার বিধান প্রবর্তন করেছে। এ সব নিরাপত্তার বিধানের মধ্যে কেবলমাত্র ইসলামেই যথার্থ ও সামগ্রিক নিরাপত্তা বিদ্যমান। যুক্তি ও বাস্তবতার নিরিখে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে একথার যথার্থতা প্রমাণিত হয়। বর্তমান রচনায় এর কিছুটা আলোকপাতে সচেষ্ট হয়েছি। প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্টজনেরা বিষয়টি একটু ভেবে দেখবেন। (সমাপ্ত)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ